সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ড্রোন হামলা: মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা

 

আবুধাবি, ইউএই — সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানার মধ্যে একটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে。 এতে কেন্দ্রের একটি বিদ্যুৎ জেনারেটরে আগুন ধরে যায় এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে তিনটি ড্রোন আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। 

বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে দুটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও তৃতীয় ড্রোনটি 'বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র'-এর ভেতরের মূল সুরক্ষাবেষ্টনীর বাইরে থাকা একটি জেনারেটরে আঘাত হানে এবং সেখানে আগুন ধরে যায়। এই ড্রোনগুলো কোথা থেকে এবং কারা উৎক্ষেপণ করেছে, তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক দূর করতে স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) দ্রুত বিবৃতি দিয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে যে, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং কেন্দ্রের আশপাশের তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। 

বারাকাহ পারমাণবিক প্রকল্পটিকে আমিরাতের অন্যতম প্রধান জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের অন্যতম ভিত্তি। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলো নিয়মিত হামলার হুমকিতে পড়লেও, কোনো সচল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা এটাই প্রথম।


বহুমাত্রিক সীমান্তে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধাবস্থা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই ড্রোন হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সীমান্তে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে:

  • লেবানন সীমান্তে তুমুল সংঘাত: ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং গত ৪৮ ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে।

    দুই দেশের কূটনীতিকরা যখন চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়াতে সম্মত হয়েছেন, ঠিক তার পরপরই এই আকস্মিক হামলা শুরু হলো। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৩,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

  • গাজায় সামরিক অভিযান: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, গাজায় তাদের যুদ্ধের একটি প্রধান লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সামরিক বাহিনী।

    গত শুক্রবার এক বিমান হামলায় হামাসের সশস্ত্র উইংয়ের শীর্ষ কমান্ডার ইজ্জেদিন আল-হাদ্দাদ নিহত হওয়ার পর তিনি এই দাবি করেন।

    এদিকে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন এবং গত সপ্তাহান্তেও সেখানে নতুন করে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

  • হরমুজ প্রণালীতে ট্রানজিট ট্যাক্স: অন্যদিকে তেহরান হরমুজ প্রণালীর ওপর সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিতর্কিত সামুদ্রিক নীতিমালা কার্যকর করতে যাচ্ছে।

    এই নতুন নিয়মের আওতায় তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত চড়া শুল্ক বা টোল আদায়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

    আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একে এক ধরনের "অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগ" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, এটি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে সরাসরি খর্ব করবে।


আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি

আমিরাতের এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশগুলো তাৎক্ষণিক ও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে "আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন" বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে, বেসামরিক ও সংবেদনশীল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা একটি বিপজ্জনক রেড লাইন অতিক্রম করার শামিল, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে উদ্দেশ্য করে কঠোর ও সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, দ্রুত কোনো ব্যাপকভিত্তিক শান্তি চুক্তি না হলে ইরানকে "খুবই কঠিন পরিস্থিতির" মুখোমুখি হতে হবে।

এর জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন চাপকে প্রত্যাখ্যান করে উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।

তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন আঞ্চলিক সন্ত্রাসী ও প্রক্সি গ্রুপকে সমর্থন দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি তেহরানের সংসদীয় নেতারা দাবি করেছেন, বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন একটি স্থায়ী পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

Munshi Firoz Al Mamun is a digital marketing strategist, PHP/Laravel developer, and journalist based in Bangladesh. He works on SEO, content strategy, and digital news publishing.

মন্তব্যসমূহ