ওয়াশিংটন — ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে এক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, একটি গ্রহণযোগ্য পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরানের সামনে "সময় ফুরিয়ে আসছে"।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ট্রাম্প, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
মার্কিন প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তেহরানের পক্ষ থেকে পাঠানো সর্বশেষ প্রস্তাবটি ওয়াশিংটন "সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়" বলে প্রত্যাখ্যান করার পর দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত শেষ পর্যায়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ইরানি নেতৃত্বকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যথায় "তাদের অস্তিত্বের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।"
ড্রোন হামলা ও আঞ্চলিক জোটে ফাটল
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে:
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা: সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ‘বারাকাহ’ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইউএই প্রশাসন এই ঘটনাকে একটি "শান্তিপূর্ণ প্রকল্পের ওপর সন্ত্রাসী হামলা" বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সরাসরি ইরানের নাম না নিলেও, আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা এর পেছনে তেহরানের হাত রয়েছে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে টানাপোড়েন: ইরানকে কাউন্টার করার জন্য মার্কিন মধ্যস্থতায় গঠিত ইসরাইল-ইউএই জোটে ফাটল দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দাবি করা হয়, ইউএই প্রেসিডেন্টের সাথে একটি "গোপন ও ঐতিহাসিক" বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে আমিরাত সরকার এই দাবিকে সম্পূর্ণ "ভিত্তিহীন" বলে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনো গোপন চুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
দেশের ভেতর চাপের মুখেও অনড় তেহরান
এদিকে, মার্কিন বিমান হামলার কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও অবকাঠামো যে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নজিরবিহীনভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এক সরকারি বৈঠকে তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, "আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এটা সত্য যে আমাদের ক্ষতি হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধ করতে হবে।"
তবে এই ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও মার্কিন চাপের মুখে ইরান মাথা নত করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পেজেশকিয়ান। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তেহরান পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ১৪ দফার নতুন প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছে। তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রস্তাবে কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমেরিকার মূল দাবি—অর্থাৎ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি।
ইসরাইলি হামলা ও লেবানন পরিস্থিতি
ওয়াশিংটন যখন সরাসরি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধও চরম আকার ধারণ করেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
এই হামলায় বৈরুতের বেকা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের শীর্ষ কমান্ডার ওয়ায়েল মাহমুদ আব্দ আল-হালিম নিহত হয়েছেন।
আইডিএফ-এর দাবি, হালিম হিজবুল্লাহর সাথে মিলে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ছক কষছিলেন। সম্ভাব্য পরবর্তী হামলার ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আইডিএফ ইতিমধ্যেই লেবাননের সাধারণ নাগরিকদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্তত ১,০০০ মিটার দূরে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন