লন্ডন — চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিশাল অগ্রগতিতে স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী তথ্য সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক স্তরের একটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, বিশেষ এক জেনোমিক পরীক্ষার মাধ্যমে লাখ লাখ স্তন ক্যানসার রোগীকে এখন আর অস্ত্রোপচার-পরবর্তী কেমোথেরাপির মুখোমুখি হতে হবে না।
এই পরীক্ষাটি সফলভাবে নির্ণয় করতে পারে কোন রোগীর ক্যানসার পুরোপুরি নির্মূল করতে কেমোথেরাপি দরকার, আর কে কেবল হরমোন থেরাপি দিয়েই সুস্থ থাকতে পারবেন।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL)-এর বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার ফল বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসার বর্তমান নির্দেশিকাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রথাগত চিকিৎসার বাইরে ‘টিউমার বায়োলজি’র ব্যবহার
স্তন ক্যানসার মূলত বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত ক্যানসার। সাধারণত অস্ত্রোপচার করে টিউমার অপসারণের পর, ক্যানসার যেন পুনরায় ফিরে না আসে সেজন্য চিকিৎসকেরা কেমোথেরাপি দিয়ে থাকেন। তবে এই অন্ধ অনুমানের চিকিৎসায় বহু রোগীকে অকারণেই ওষুধের মারাত্মক বিষাক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ্য করতে হতো।
এই সংকট সমাধানে গবেষকেরা ‘প্রোসিগনা’ (Prosigna) নামক একটি মলিকুলার বা জেনোমিক টেস্ট ব্যবহার করেন। এই পরীক্ষাটি রোগীর ক্যানসার টিস্যুর নমুনা থেকে সরাসরি ক্যানসার বৃদ্ধির জন্য দায়ী ৫০টি সুনির্দিষ্ট জিনের আণবিক সক্রিয়তা বিশ্লেষণ করে।
এই ‘অপটিমা’ ট্রায়ালে যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের ৪,৪২৯ জন স্তন ক্যানসার আক্রান্ত নারী অংশ নেন, যাদের বয়স ৪০ বছর বা তার বেশি। তারা সবাই হরমোন-সেন্সিটিভ (Hormone-positive) ক্যানসারে ভুগছিলেন, যা মোট স্তন ক্যানসারের প্রায় ৮০ শতাংশ।
ট্রায়ালের মূল ফলাফল ও তথ্যচিত্র
গবেষণায় অংশ নেওয়া বিপুল সংখ্যক রোগীর টিউমার প্রোসিগনা টেস্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করার পর রোগীদের দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়:
ঝুঁকি সূচক: জিনের সক্রিয়তা বিশ্লেষণ করে যাদের স্কোর কম (৬০ বা তার নিচে) পাওয়া যায়, তাদের কেমোথেরাপি ছাড়াই শুধু হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়। আর যাদের স্কোর বেশি ছিল, তারা প্রথাগত কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন করেন।
৫ বছরের ফলাফল: দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ট্র্যাকিং করার পর দেখা যায়, যারা কেমোথেরাপি নিয়েছিলেন তাদের ক্যানসারমুক্ত হয়ে বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৪.৮%। অন্যদিকে, যারা কেমোথেরাপি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে কেবল হরমোন থেরাপি নিয়েছিলেন, তাদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩.৬%।
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কম স্কোর পাওয়া রোগীদের জন্য কেমোথেরাপি কোনো বাড়তি সুরক্ষাই দিতে পারেনি। ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (৬৮%) স্তন ক্যানসার রোগী কোনো কেমোথেরাপি ছাড়াই নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারেন।
রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতের সাশ্রয়
কেমোথেরাপির ক্ষতিকারক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—এটি ক্যানসার কোষের পাশাপাশি শরীরের সুস্থ কোষ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে রোগীরা চুল পড়ে যাওয়া, তীব্র বমি ভাব ও ক্লান্তি ছাড়াও অকাল মেনোপজ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং স্থায়ী বন্ধ্যত্বের মতো জীবন পরিবর্তনকারী সমস্যার মুখোমুখি হন।
এই পরীক্ষার ফলে প্রতি বছর শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (NHS) থেকেই ৫,০০০-এর বেশি রোগীকে কেমোথেরাপির ধকল থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
চিকিৎসকদের মতে, এটি একদিকে যেমন রোগীদের অপ্রয়োজনীয় শারীরিক ও মানসিক ট্রমা থেকে রক্ষা করবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের বিশাল অর্থনৈতিক ও চিকিৎসার সম্পদ সাশ্রয় করবে।
সম্মেলনে চূড়ান্ত ডেটা উপস্থাপন
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক সম্মেলন—আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (ASCO 2026)-তে এই গবেষণার বিশদ প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ইউসিএল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের স্তন অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং এই ট্রায়ালের প্রধান তদন্তকারী রবার্ট স্টেইন বলেন, "অপটিমা ট্রায়ালটি ক্যানসার চিকিৎসার একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের সমাধান করেছে। আমরা ক্লিনিক্যাল ফিচারের বদলে সরাসরি টিউমারের নিজস্ব বায়োলজি দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি ক্যানসার চিকিৎসাকে আরও নির্ভুল ও ব্যক্তিগত করার ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক।"
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই জেনোমিক স্ক্রিনিং শতভাগ নিরাপদ প্রমাণিত হলেও, প্রাক-মেনোপজ বা ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা জানতে ‘অপটিমা-ইয়ং’ নামের আরেকটি পৃথক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, যার চূড়ান্ত ফলাফল আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন