শান স্টেট — মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীন সীমান্তবর্তী একটি অবরুদ্ধ গ্রামে খনির বিস্ফোরক ডিপোতে আকস্মিক এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৫৫ জন নিহত হয়েছেন।
রবিবারের এই শক্তিশালী বিস্ফোরণের ধাক্কায় আশেপাশের পুরো এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এবং আরও প্রায় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে শান রাজ্যের নামখাম টাউনশিপের 'কাউং টাট' (কোনো কোনো প্রতিবেদনে কাউংটুপ নামে উল্লিখিত) গ্রামে।
এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি বর্তমানে জান্তাবিরোধী আদিবাসী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ (TNLA)-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
হতাহতের পরিসংখ্যান ও ধ্বংসের চিত্র
স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ও স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুরের দিকে ঘটা এই বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে প্রায় সম্পূর্ণ একটি আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
নিহত ও আহতের সংখ্যা: প্রাথমিক উদ্ধার তৎপরতার পর জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ এবং ২৫ জন নারী রয়েছেন।
এছাড়া মৃতদের মধ্যে অন্তত ৬টি শিশু রয়েছে বলে উদ্ধারকর্মীরা নিশ্চিত করেছেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৭৪ জনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আকাশচুম্বী ধোঁয়ার কুণ্ডলী: বিস্ফোরণের পরপরই পুরো গ্রামজুড়ে একের পর এক সেকেন্ডারি বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে এবং আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, যা বহুদূর থেকেও দৃশ্যমান ছিল।
ব্যাপক ঘরবাড়ি ধ্বংস: দুর্ঘটনাস্থলের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি বিশাল ও গভীর খাদের (ক্রেটার) সৃষ্টি হয়েছে এবং চারপাশের ১০০-এরও বেশি কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
অস্থিতিশীল খনিজ বিস্ফোরক ও নিরাপত্তার অভাব
বিদ্রোহী গোষ্ঠী টিএনএলএ (TNLA) তাদের নিজস্ব টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে, তাদের অর্থনৈতিক বিভাগের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় খনি ও পাথর কোয়ারিতে ব্যবহারের জন্য এই ডিপোতে প্রচুর পরিমাণে 'জেলিগনাইট' (Gelignite) মজুত রাখা হয়েছিল।
সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের মূল্যবান রত্ন ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীল।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকা জেলিগনাইট অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আকাশসীমা লঙ্ঘনের আতঙ্ক ও গণক্ষোভ
বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কাঁপতে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে মনে করেছিলেন যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী হয়তো তাদের ওপর বিমান থেকে কোনো বড় ধরনের বোমাবর্ষণ করেছে।
অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক গ্রামীণ নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কোনো ধরনের জননিরাপত্তা বিধি না মেনে সাধারণ মানুষের বসবাসের এত কাছাকাছি কেন এমন প্রাণঘাতী বিস্ফোরক মজুত কেন্দ্র খোলার অনুমতি দেওয়া হলো, তার জবাবদিহি স্থানীয় প্রশাসনকে করতে হবে।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ধ্বংসস্তূপের মাঝে মানুষের আহাজারি আর আর্তনাদে কাউং টাট গ্রামে এখন এক হাড়হিম করা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন