ওয়াশিংটন ও তেহরানের সমঝোতা: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির আশা, উন্মুক্ত হচ্ছে হরমুজ প্রণালী
ইসলামাবাদ / জেনেভা — দীর্ঘ তিন মাসের তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের পর অবশেষে একটি বড় ধরণের কূটনৈতিক অগ্রগতির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
সোমবার উভয় দেশের পক্ষ থেকে একটি ঐতিহাসিক ১৪-দফা শান্তি রূপরেখা বা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ অনুমোদন করা হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি বিশেষ সম্মেলনে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।
এই সম্ভাব্য চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক বাজারে আসার পরপরই তেলের দামে বড় ধরণের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩.৮% কমে ৮৪.০২ ডলারে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তির প্রধান ১৪টি শর্ত: আগামী ৬০ দিনের রূপরেখা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই খসড়া সমঝোতা পত্রে একটি ধাপে ধাপে উত্তেজনা প্রশমনের প্রোটোকল নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত রূপ পাবে:
আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি: সমস্ত সামরিক ফ্রন্টগুলোতে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সব ধরণের শত্রুতা ও অভিযান বন্ধ করা হবে, যার মধ্যে লেবানন সীমান্ত বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত।
নৌ-অবরোধ ও হরমুজ প্রণালী সচলকরণ: মার্কিন সামরিক বাহিনী আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের সমস্ত বন্দর থেকে তাদের কঠোর নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। এর বিপরীতে, ইরানও একই সময়ের মধ্যে ‘হরমুজ প্রণালী’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ টোল-মুক্ত ঘোষণা করে খুলে দেবে।
পারমাণবিক অঙ্গীকার ও সম্পদ অবমুক্তকরণ: ইরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর থাকা সবধরণের জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার শুরু করবে। তবে তেহরান শর্ত দিয়েছে যে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা তাদের স্থগিত (ফ্রিজড) সম্পদের অন্তত অর্ধেক অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তির পরবর্তী ধাপের আলোচনা শুরু হবে না।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা বা সার্বভৌমত্বে কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা সহযোগীরা ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন তহবিল গঠন করবে।
জাতিসংঘের আইনি নিরাপত্তা: এই শান্তি চুক্তিটিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ও বাধ্যতামূলক করতে পরবর্তীতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি আনুষ্ঠানিক রেজোলিউশনের মাধ্যমে এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত করা হবে।
তেহরানে ১৫ ঘণ্টার কূটনৈতিক তৎপরতা
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়া একটি বড় ধরণের কূটনৈতিক সাফল্য, কারণ রবিবার সকালেই পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী দক্ষিণ বৈরুতের হিজবুল্লাহ ঘাঁটিতে বড় ধরণের হামলা চালালে ৩ জন নিহত হন, যার ফলে ইরান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে আলোচনাকে "অর্থহীন" বলে আখ্যা দেয় এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
এই চরম মুহূর্তে কাতারের একটি বিশেষ কূটনৈতিক দল সরাসরি তেহরানে পৌঁছে টানা ১৫ ঘণ্টার একটি ম্যারাথন বৈঠক পরিচালনা করে। তারা ইরানের শেষ মুহূর্তের সংশোধনীগুলো খসড়া টেক্সটে যুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে ইরানি নেতৃত্বকে শান্ত করে এবং চুক্তিটিকে রক্ষা করে।
ঠিক এই জটিল সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি জরুরি বার্তা দিয়ে লিখেছিলেন:
"এই হামলাটি মোটেও হওয়া উচিত ছিল না, বিশেষ করে এমন একটি দিনে যখন আমরা ইরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির এত কাছাকাছি রয়েছি। সব পক্ষকে এখনই শান্ত হওয়ার অনুরোধ করছি... কোনোভাবেই যেন আমরা এই সুযোগটি হাতছাড়া না করি!"
জয়ের দাবি বনাম অমীমাংসিত শঙ্কা
চুক্তিটি নিশ্চিত হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে নিজেদের ‘বিজয়ী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে দাবি করেছেন যে এই মহান চুক্তিটি পুরো অঞ্চলে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও political স্বার্থ চিরতরে সুরক্ষিত করবে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখবে; সেখানে ইরানি সামরিক কমান্ড এটিকে তাদের "সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক বিজয়" হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ফ্রান্সে শুরু হওয়া জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনেও এই বিষয়টি এখন প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বনেতারা এই ডি-এস্কেলেশনকে স্বাগত জানালেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দুটি বড় দুর্বলতা বা ‘ব্লাইন্ডস্পট’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন:
১. ইসরায়েল ফ্যাক্টর: চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও, ইসরায়েল এই মার্কিন-ইরান ব্যাকচ্যানেল আলোচনার অংশ ছিল না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেননি, যা যেকোনো মুহূর্তে এই শান্তি চুক্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ২. বাণিজ্যিক রুট সচল হওয়ার বিলম্ব: হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা এলেও আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখনই পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা ‘অ্যাডনক’ (ADNOC) সতর্ক করেছে যে সাগরে মাইনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আগামী বছরের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
